1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৮:৫০ অপরাহ্ন

আদালতে বাড়ছে বাংলার ব্যবহার

  • প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ১৩৪ বার পঠিত হয়েছে

ল লাইফ রিপোর্টঃ   অধস্তন আদালতের প্রায় সব রায়ই বাংলায় দেওয়া হচ্ছে। উচ্চ আদালতেও কিছু কিছু রায় বাংলায় দেওয়া হয়। বাংলায় রায় দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে আইনজীবী-বিচারকদের সওয়াল-জবাবেও বাংলার ব্যবহার। নব্বইয়ের দশকে উচ্চ আদালতে বাংলাভাষার ব্যবহার একেবারেই কম ছিল। বর্তমানে হাইকোর্টের কয়েকজন বিচারপতি নিয়মিত বাংলায় রায় দিচ্ছেন। সম্প্রতি আপিল বিভাগ থেকেও বাংলায় রায় দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া আদালতে বাংলাভাষার প্রয়োগকে আরও সহজ করতে আইন কমিশনের উদ্যোগে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলা পরিভাষা নিয়ে মুদ্রিত হয়েছে ‘আইন-শব্দকোষ’। সব মিলিয়ে দিনে দিনে আদালতে বাংলাভাষার ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদ বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এ ছাড়া ১৯৮৭ সালে বাংলাভাষা প্রচলন আইন তৈরি করা হয়। এ আইনের ৩(১) ধারায় বলা আছে, এ আইন প্রবর্তনের পর দেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার‌্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে।

কিন্তু এর পরও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পুরোপুরি বাংলাভাষার প্রচলন আজও সম্ভব হয়নি। এ কারণে বিচারপ্রার্থীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করেন অনেকেই। বিষয়টি লক্ষ্য করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলায় রায় দিতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরেই একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতিরা উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলনের ওপর গুরুত্ব আরোপের কথা বলে আসছেন। এসব প্রেক্ষাপটে বর্তমানে উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়াত বিচারপতি এআরএম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রথম হাইকোর্টে বাংলায় আদেশ দেওয়া শুরু করেন। এর পর সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি হামিদুল হক, বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দেন। ২০১০ সালের দিকে বিচারপতি খায়রুল হক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ, চার নদী সংরক্ষণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বাংলায় দেন। বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীও কয়েকটি রায় বাংলায় দিয়েছেন।

হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালে দেওয়া রায় বাংলায় লিখেছেন। তিন-চার বছর ধরে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বেশিরভাগ অন্তবর্তীকালীন আদেশ, জামিন আদেশ বাংলায় লিখছেন। প্রতি সপ্তাহে এ বিচারপতি আড়াইশ থেকে তিনশ আদেশ বাংলায় লেখেন। আর রায়গুলোর মধ্যে কিছু বাংলায় এবং কিছু ইংরেজিতে লেখেন। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৬ সালের ১৫ জুন যে রায় দেন সেটিও বাংলায় দেওয়া।

দেশের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় মামলা বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে হত্যাযজ্ঞের মামলাটি। এ মামলায় হাইকোর্টের তিন বিচারপতির দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় ২৯ হাজার ৬৭ পৃষ্ঠা, এর ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠা বাংলায় লিখেছেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী। এর শব্দসংখ্যা ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৮। বাংলাভাষায় লেখা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রায় এটি। এ বিচারপতি ২০১০ সালে নিয়োগ পাওয়ার পরের বছর থেকেই ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে তিনি বেশিরভাগ আদেশ ও রায় বাংলায় দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মামলায় রায় ও আদেশ বাংলায় দিয়েছেন তিনি।

২০১০ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায় বাংলায় রায় দেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে মামলায় ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতি রায় দেন। তাদের মধ্যে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল বাংলায় রায় লেখেন। এর পর থেকে তিনি নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিচ্ছেন। তুরাগসহ দেশের সব নদ-নদীকে জীবনসত্তা ঘোষণা করে দেওয়া রায়টি বাংলায় লেখেন এ বিচারপতি।

এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিনটি রায় বাংলায় দেন বলে জানা গেছে। সবশেষ গত বুধবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার রায়টি বাংলায় দেন। এ বিচারপতি এর আগেও কয়েক হাজার রায় ও আদেশ বাংলায় লিখেছেন। এ ছাড়া বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান, বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম, বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার, বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান, বিচারপতি মো. জাকির হোসেন, বিচারপতি জাহিদ সারোয়ার কাজলসহ অনেক বিচারপতিই বাংলায় রায় দিচ্ছেন। অনেক বিচারপতি এখন ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েও বাংলায় রায় লেখেন।

এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়াটা অত্যাবশ্যক। কারণ দেশের নাগরিক বিশেষ করে, যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের মামলার রায় ও আদেশ মাতৃভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া আমরা বহু আগেই ঔপনিবেশিক আমল পেরিয়ে এসেছি। তাই সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন বলেন, স্বাভাবিক রীতিতে উচ্চ আদালতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও জনস্বার্থ জড়িত বিষয়ে উচ্চ আদালত বাংলায় রায় দিচ্ছেন, যা ইতিবাচক পরিবর্তন। ১০ বছর আগেও বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়ার বিষয়টি ছিল হাতেগোনা। আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবীরা বাংলায় যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। বিচারপতিরা বাংলায় জবাব দিয়ে থাকেন। উচ্চ আদালতের কার্যক্রমে বাংলাভাষার প্রচলন আরও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।

সূত্র: আমাদের সময়

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ