1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ০২:১০ অপরাহ্ন

উচ্চ আদালতে মামলার রায়ে বাংলার ব্যবহার বাড়ছে

  • প্রকাশিত হয়েছে : রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৯৮ বার পঠিত হয়েছে

ল লাইফ রিপোর্ট:  প্রথাগতভাবে যুগ যুগ ধরে ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন মামলার রায় লিখে আসছেন সুপ্রিম কোর্ট তথা সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা। তবে এ প্রথা থেকে বের হয়ে আসছেন তারা। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত অনেক মামলার রায় বাংলায় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। পিলখানা হত্যা মামলার ২৯ হাজার পৃষ্ঠার রায়, সবশেষ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলার রায় এর মধ্যে অন্যতম।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারপতিদের বাংলায় রায় লেখার উদ্যোগ উৎসাহব্যঞ্জক এবং ইতিবাচক। সর্বোচ্চ আদালতে মাতৃভাষা বাংলার আরও বেশি প্রচলনে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টে বাংলা ভাষায় রায় ও মামলা শুনানির প্রবণতা আগের থেকে অনেক বেড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অনেক কাজ বাংলা ভাষাতে হয়। এখন অনেক বিচারপতি স্বেচ্ছায় বাংলা ভাষায় রায় দিচ্ছেন। এটা ইতিবাচক পরিবর্তন। অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কারণ বাংলা ভাষায় রায় হলে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারেন আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে কী বলতে এবং বোঝাতে চেয়েছেন।’ সর্বোচ্চ আদালতে মাতৃভাষার ব্যবহার আরও বাড়ানো উচিত বলেও মন্তব্য করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। অনেক বিচারপতি নিয়মিত বাংলায় রায় দিচ্ছেন। এটা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। আমি তো মনে করি, মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমি নিজেও এখন অনেক মামলায় বাংলা ভাষাতে শুনানি করি। তবে আমাদের অনেক নজির ও আইন ইংরেজিতে। তাই হাইকোর্টে ব্যাপকভাবে বাংলার প্রচলনে সেগুলো অনুবাদের উদ্যোগ নিতে হবে।
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সাবেক আইনমন্ত্রী

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা যায়, অধস্তন আদালতের প্রায় সব রায়ই বাংলায় দেওয়া হচ্ছে। উচ্চ আদালতেও বাংলায় রায় দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। মামলার শুনানিতে বাংলার ব্যবহার বেড়ে চলছে। নব্বইয়ের দশকে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার একেবারেই কম ছিল। বর্তমানে হাইকোর্টের কয়েকজন বিচারপতি নিয়মিত বাংলায় রায় দিচ্ছেন। আপিল বিভাগ থেকেও বাংলায় রায় দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আদালতে বাংলা ভাষার প্রয়োগকে আরও সহজ করতে আইন কমিশনের উদ্যোগে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলা পরিভাষা নিয়ে মুদ্রিত হয়েছে ‘আইন-শব্দকোষ’। আবার ইংরেজিতে লেখা রায় বাংলায় অনুবাদের জন্য এই ভাষার মাসেই ‘আমার ভাষা’ নামে সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। সবমিলিয়ে, দিনে দিনে আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা। এছাড়া ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন তৈরি করা হয়। এ আইনের ৩(১) ধারায় বলা আছে, আইনটি প্রবর্তনের পর দেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল-জবাব (প্রশ্নোত্তর) এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে।

কিন্তু এর পরও দেশের সর্বোচ্চ আদালতে পুরোপুরিভাবে বাংলার প্রচলন হয়নি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলায় রায় দিতে বিচারপতি-বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া কয়েক বছর ধরেই একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতিরা উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলনের ওপর গুরুত্বারোপের কথা বলে আসছেন। এসব প্রেক্ষাপটে বর্তমানে উচ্চ আদালতে বাংলার প্রচলন বাড়ছে।

প্রয়াত বিচারপতি এ আর এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রথম হাইকোর্টে বাংলায় আদেশ দেওয়া শুরু করেন। এরপর সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে কাজী এবাদুল হক, হামিদুল হক, আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় ঘোষণা করেন। ২০১০ সালের দিকে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ, চার নদী সংরক্ষণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বাংলায় দেন। বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীও কয়েকটি রায় বাংলায় দিয়েছেন।

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালে দেওয়া রায় বাংলায় লিখেছেন। গত তিন-চার বছর ধরে এ বিচারপতি বেশিরভাগ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ, জামিনাদেশ বাংলায় লিখছেন। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৬ সালের ১৫ জুন যে রায় দেন, সেটিও বাংলায় লেখা হয়েছিল।

দেশের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় মামলাটি হলো- পিলখানা হত্যা মামলা। এ মামলায় হাইকোর্টের তিন বিচারপতির দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়টি ২৯ হাজার ৬৭ পৃষ্ঠার। এর ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠা বাংলায় লিখেছেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী। এর শব্দ সংখ্যা ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৮টি। বাংলা ভাষায় লেখা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রায় এটি। এ বিচারপতি ২০১০ সালে নিয়োগ পাওয়ার পরের বছর থেকেই ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে তিনি বেশিরভাগ আদেশ ও রায় বাংলায় দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মামলায় রায় ও আদেশ বাংলায় দিয়েছেন তিনি।

২০১০ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায় বাংলায় রায় দেন। সংবিধানের ষোড়শ (১৬তম) সংশোধনী নিয়ে মামলায় ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতি রায় দেন। তাদের মধ্যে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল বাংলায় রায় লেখেন। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিচ্ছেন। তুরাগসহ দেশের সব নদ-নদীকে জীবনসত্ত্বা ঘোষণা করে দেওয়া রায়টি বাংলায় লেখেন এ বিচারপতি।

সবশেষ গত বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার রায়টি বাংলায় দেন। এ বিচারপতি এর আগেও কয়েক হাজার রায় ও আদেশ বাংলায় লিখেছেন।

এছাড়া বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান, বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম, বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার, বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান, বিচারপতি মো. জাকির হোসেন, বিচারপতি জাহিদ সারোয়ার কাজলসহ অনেক বিচারপতিই বাংলায় রায় দিচ্ছেন। অনেক বিচারপতি এখন ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েও বাংলায় রায় লেখেন।

বাংলা ভাষায় রায় লেখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়াটা অত্যাবশ্যক। কারণ দেশের নাগরিক বিশেষ করে, যারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের মামলার রায় ও আদেশ মাতৃভাষায় হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া আমরা বহু আগেই ঔপনিবেশিক আমল পেরিয়ে এসেছি। তাই সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়।’

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ