1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৩৮ পূর্বাহ্ন

আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে যে আইন

  • প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৫৪৯ বার পঠিত হয়েছে

ল লাইফ রিপোর্ট:  বাংলাদেশ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম হয়। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে নবগঠিত রাষ্ট্রের সূচনা হয়। ত্রিশ লাখ শহীদের তাজা রক্ত এবং দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে জন্মলাভকারী এ রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা; যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক-সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।

সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে, সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমানভাবে বিবেচনা করা হবে। একই অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

সমাজে বসবাস করতে গিয়ে পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। মানুষ পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য কলহ, যৌতুক প্রথা, সম্পত্তিগত বিরোধ, মাদকাসক্তি, অর্থ আত্মসাৎ, সাইবার অপরাধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, এসিড অপরাধ, ধর্ষণ, পরকীয়া, মানব পাচারসহ নানা কারণে সামাজিক অপরাধে প্রবৃত্ত হয়। প্রয়োজন হয় আইনের আশ্রয় নেয়ার। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতা এবং পারিপার্শ্বিক অসহায়ত্বের কারণে মানুষ অনেক সময় আইনের আশ্রয় লাভ থেকে বঞ্চিত হয়।

অন্যদিকে সব নাগরিকের সুবিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরের পরিক্রমায় দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়েছে। তারপরও বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১.৮০ শতাংশ। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত দেশে অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের আইনি সহায়তা প্রদান করার জন্য কোনো আইনগত বিশেষ কাঠামো ছিল না। তবে Legal Remembrancer’s Manual, 1960-এর বিধান অনুসারে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের শাস্তি যদি হয় মৃত্যুদণ্ড এবং ওই অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি তার পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে না পারেন, তাহলে কেবল এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় খরচে তার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করার বিধান রয়েছে।

এ বিধান অবশ্যপালনীয় এবং তা অনুসরণ না করলে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া অবৈধ হবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্য কোনো ধরনের আইনগত সহায়তার জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছিল না। ২০০০ সালেই সর্বপ্রথম আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচারপ্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীদের আইনগত সহায়তা প্রদানের জন্য সরকার প্রণয়ন করে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন। এ আইন অনুসারে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টসহ দেশের প্রতিটি জেলায় আইনগত সহায়তা প্রদানের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি প্রতি জেলার জেলা জজ আদালতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠকে মিলিত হয়।

আইনগত সহায়তা পেতে ইচ্ছুক যে কোনো ব্যক্তি জেলা জজ আদালতে অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিস অথবা শ্রম আদালত বা চৌকি আদালতে অবস্থিত অফিসে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে পারবেন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস থেকে একজন বিচারক জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তিনিই মূলত আইনগত সহায়তাসংক্রান্ত সার্বিক বিষয় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে জেলা কমিটিতে উপস্থাপন করেন। তারপর জেলা কমিটিতে তা অনুমোদিত হয়।

দেখা গেছে, দূরত্বের কারণে গ্রামে বসবাসকারী অসহায় মানুষের পক্ষে আইনের আশ্রয় লাভের জন্য জেলা শহরে আসা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। পরবর্তী সময়ে আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য ২০১১ সালে ইউনিয়ন কমিটি ও উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারা গ্রামে বসবাস করেন তারা সরাসরি ইউনিয়ন কমিটি অথবা উপজেলা কমিটিতে আইনগত সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন এবং ওই কমিটি অতি দ্রুত সেই আবেদন জেলা কমিটিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।

আবেদন মঞ্জুরের পর সংশ্লিষ্ট কমিটি বিধি মোতাবেক তালিকাভুক্ত আইনজীবী থেকে আবেদনকারীর জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে আইনগত সহায়তা বলতে দায়েরযোগ্য/দায়েরকৃত বা বিচারাধীন মামলায় আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করাই ছিল সংশ্লিষ্ট কমিটির কাজ। ধীরে ধীরে আইনগত সহায়তার কলেবর বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা, ২০১৫ অনুসারে যে কোনো ব্যক্তি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আইনগত পরামর্শপ্রাপ্তি অথবা মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার প্রাপ্ত আবেদনের ভিত্তিতে আইনগত পরামর্শ প্রদান করতে পারেন এবং আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে পারেন। এমনকি কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল থেকে কোনো মামলা বিকল্প পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কাছে পাঠানো হলে তিনি পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে থাকেন।

আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার যেমন মৌলিক অধিকার, তেমনি আইনগত সহায়তা পাওয়া নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্র প্রদত্ত এ সেবা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল জেলা লিগ্যাল এইড দিবস পালন করা হয়। প্রত্যেক লিগ্যাল এইড অফিসের হটলাইন রয়েছে যেখানে সরাসরি ফোন করে আইনগত সহায়তাসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে জাতীয় পর্যায়ে সম্পূর্ণ টোল ফ্রি ১৬৪৩০ নম্বরের মাধ্যমে হেল্পলাইন সার্ভিস কার্যক্রম বাস্তবায়ন চালু করেছে।

এ শর্টকোড নম্বরটি নিয়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি কল সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ এপ্রিল ২০১৬ সরকারি আইনগত সহায়তায় জাতীয় হেল্পলাইন কল সেন্টারটি উদ্বোধন করেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ৯ হাজার ১৬০ জন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা থেকে আইনি সহায়তা পান। ১০ বছরের মাথায় এ সংখ্যা এখন তিনগুণের বেশি।

গত বছর এ সংস্থা থেকে আইনি সহায়তা পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৭২০ জন। আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার তথ্য অনুসারে, শুধু দেশের ৬৪টি জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে ১০ বছরে সরকারি আইনি সহায়তা নিয়েছেন ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৭ ব্যক্তি। কিন্তু অনেক জেলায় ইউনিয়ন কমিটি ও উপজেলা কমিটির কার্যক্রম কিছুটা স্থবিরভাবে চলছে।

তৃণমূল পর্যায়ের অসহায় দরিদ্র মানুষ এখনও আইনগত সহায়তা কার্যক্রম এবং টোল ফ্রি হটলাইন নম্বর সম্পর্কে সচেতন নয়। প্রত্যেক ইউনিয়ন কমিটি, উপজেলা কমিটি ও জেলা কমিটিকে আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। চলচ্চিত্র নির্মাতাদের দিয়ে আইনগত সহায়তাসংক্রন্ত নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমা তৈরি করে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ব্যাপক প্রচারণা জনগণকে অধিকার সচেতন করবে, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার পূরণে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

শেখ সাদী রহমান

সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ