1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন

করনাকালে আসামির আত্মসমর্পণ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা

  • প্রকাশিত হয়েছে : সোমবার, ১ জুন, ২০২০
  • ৪৪৮ বার পঠিত হয়েছে

মো. আজিজুর রহমান দুলু||

বর্তমানে দেশব্যাপী চলমান  করোনা ভাইরাস  (কোভিড-১৯) রোগ সংক্রমন পরিস্থিতির কারনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হতে ইতোমধ্যে যে সকল বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে সেই সকল বিজ্ঞপ্তির মধ্যে 214 এবং 230 নম্বর  বিজ্ঞপ্তি হতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে বাংলাদেশের অধঃস্তন আদালতসমূহকে অতীব জরুরী বিষয় গুলিকে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হইতে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে ।  কিন্তু ইহা পরিতাপের বিষয় হলো এই যে উক্ত 214 নম্বর বিজ্ঞপ্তি পাওয়ার পরে বাংলাদেশের  বিভিন্ন জেলার সংশ্লিষ্ট চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগন এবং চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটগন উক্ত সার্কুলার কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে শুধুমাত্র হাজতী আসামির জামিন শুনানির জন্য ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা  উল্লেখ করে আলাদা আলাদা নোটিশ জারি করেছেন । সেই মোতাবেক আজ অবধি বাংলাদেশের কোথাও কোন আসামী করণাকালে বাংলাদেশের কোন অধস্তন আদালতের সংশ্লিষ্ট  ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করার সুযোগ পান নাই । ফলে অনেক নিরীহ মানুষ বিভিন্ন মামলায় আসামী হয়ে পালিয়ে আছেন অথবা পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে জামিন লাভ করেছেন কিংবা  জেল হাজতে বা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন । এই ঘটনার ব্যাপকতা বুঝাইতে একথাও এখানে  বলতেছি যে, কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ আমাকে মোবাইল ফোনে অবগত করলেন যে জমি জমা কে কেন্দ্র করে বিদ্যমান সিভিল   ম্যাটার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধান কাটার মামলায় তাকে একজন আসামী আসামি করা হয়েছে।  তিনি আমাকে জানালেন তিনি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে  আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করতে চান কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং আইনের ভুল ব্যাখ্যার কারণে তা করতে পারতেছেন না ।  যাই হোক এবার আসি আসল কথায়,  214 নম্বর বিজ্ঞপ্তি অনুসারে জামিন শুনানির কথা বলা হয়েছে । উক্ত বিজ্ঞপ্তির  কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে,  কোন ব্যক্তি আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার পর আত্মসমর্পণ করলে তার জামিন শুনানি করা যাইবে না । 230 নম্বর বিজ্ঞপ্তি মুলে ইহা পরিষ্কার যে, অতীব জরুরী বিষয় সমূহ অধস্তন আদালতের বিচারকবৃন্দকে নিষ্পত্তি করিতে হইবে.।  এখন প্রশ্ন হলো আত্মসমর্পণের জামিনের আবেদন একটি অতীব  জরুরী বিষয় কিনা? বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান অনুসারে অতীব  শব্দটি একটি বিশেষণ যার অর্থ অত্যন্ত.  অতীব জরুরী বিষয়  এর অর্থ দাঁড়ায়  সোজা বাংলায় অত্যন্ত জরুরি বিষয়.।  এখন আমাদের দেখা দরকার   আসামির আত্মসমর্পণের জামিনের আবেদন  প্রথমত একটি জরুরি বিষয় কিনা ? এবং দ্বিতীয়তঃ অত্যন্ত জরুরী বিষয় কিনা ?

https://www.dictionary.com/browse/urgent অনুসারে  আর্জেন্ট অর্থ compelling or requiring immediate action or attention.  আবার https://www.ldoceonline.com/dictionary/as-a-matter-of-urgency অনুসারে  আর্জেন্ট অর্থ if something is done or should be done as a matter of urgency, it is done or should be done very soon. That procedure should be streamlined as a matter of urgency.  উপরোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী আসামির আত্মসমর্পণের বিষয়টি এই জন্য জরুরী যে   আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করা হলে  তাহা সঙ্গে সঙ্গেই নিষ্পত্তি করিতে হইবে.।  ইহা কোন ভাবেই অন্য একদিন নিষ্পত্তির জন্য রাখা যাবে না.। এই বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে নিষ্পত্তি করার নিরিখে একটি জরুরি বিষয়। 

 জামিনের আবেদন জরুরী বিষয় কিনা এই বিষয়ে আমাদের উচ্চ আদালতে  আমার জানামতে কোন মামলায় প্রশ্ন না উঠলেও ভারতের দিল্লি হাইকোর্টে এই প্রশ্ন উঠেছিল  একটি মামলায়.।    মামলাটি হলো Paramjeet Singh vs The State on 2 September, 1996;  1996 IVAD Delhi 588, 1997 CriLJ 522, 64 (1996) DLT 22, 1996 (38) DRJ 737.।  উক্ত মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে  “Undoubtedly all bail applications are urgent applications”   অর্থাৎ  সকল জামিনের আবেদন অন্তর্ভুক্ত করে   আসামির আত্মসমর্পণের মাধ্যমে প্রদত্ত জামিনের আবেদনও । 

এখন দেখার বিষয় আত্মসমর্পণের জামিনের আবেদন অত্যন্ত জরুরী বিষয় কিনা.।   করনাকালের এই পরিস্থিতিতেও সারাদেশব্যাপী যে সকল মামলা থানায় রেকর্ড  হয়েছে বা হইতেছে  সেই সকল মামলার অনেক মামলাতেই অনেক গ্রেপ্তারকৃত আসামির রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে  এবং অনেক মামলায় রিমান্ড শুনানি অন্তে রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে. ।  রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার কারণে অনেক আসামিকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে. ।  আসামীকে গ্রেফতারের পরে যেহেতু রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে এবং শুনানী ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে কিংবা হইতেছে সেহেতু রিমান্ড আবেদনের বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরী বিষয় এর মধ্যে পড়ে বলে বাংলাদেশের অধঃস্তন আদালতে কর্মরত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগন  উক্ত রিমান্ড আবেদন গুলিকে নিষ্পত্তি করেছেন. । রিমান্ড আবেদনের সাথে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে প্রদত্ত জামিন আবেদনের বিষয়টি মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ এর মত বিষয়. । 

যেকোনো আসামীকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের কাঠামো অনুসারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চাইতে পারেন. ।  উক্ত রিমান্ড আবেদনের কারণ বিদ্যমান থাকলে কারণ উল্লেখপূর্বক সংশ্লিষ্ট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মনজুর করিতে পারেন অন্যথায় যথাযথ কারণ না থাকলে উক্ত রিমান্ড আবেদন না মঞ্জুর করিবেন.।   এখানে মোদ্দা কথা হলো রিমান্ড আবেদন যেহেতু অত্যন্ত জরুরী বিষয় বলে নিস্পত্তি করা হচ্ছে সেইহেতু আত্মসমর্পণের বিষয়টিও অবশ্যই অত্যন্ত জরুরি বিষয় এই জন্য যে, আত্মসমর্পণকারী আসামি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সংবিধানের 31 নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনের আশ্রয় লাভের মৌলিক অধিকার রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করতে পারেন.।   কেননা কোন ব্যক্তি আসামি হিসেবে আত্মসমর্পণ করলে পুলিশ অর্থাৎ তদন্তকারী কর্মকর্তা যেমন তার ক্ষেত্রে রিমান্ড চাইতে পারেন না একইভাবে ভুল করে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করলে আদালত আত্মসমর্পণকারী আসামির ক্ষেত্রে রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারেন না. । 

এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো উচ্চ আদালতের নজির হল Kedar vs State on 22 February, 1977: 1977 Cri.LJ 1230 মামলার রায়.।  উক্ত মামলার রায়ে একথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “Section 167 applies only when a person is arrested and detained in custody by the police.” অর্থাৎ কোন ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার না করিলে তার ক্ষেত্রে রিমান্ড অর্থাৎ 167 ধারা ব্যবহার করা যায় না . ।  

যেহেতু রিমান্ডের আবেদন করার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করে রিমান্ডের আবেদন না করার সুযোগ  সেহেতু যে কোন ব্যক্তির ইহা মৌলিক অধিকার আত্মসমর্পণের মাধ্যমে রিমান্ড নামক ইল ট্রিটমেন্ট  পাওয়ার ক্ষেত্র হইতে নিজেকে নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তর করা. 

উপরোক্ত কারণে এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট হতে প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তি অনুসারে শুধুমাত্র  হাজতী আসামির জামিন শুনানি  করা সঠিক কাজ নহে.।   শুধুমাত্র  হাজতী আসামির জামিন শুনানি করা যদি সঠিক কাজ হইত তাহলে রিমান্ড শুনানি করা  ও  তা নিষ্পত্তি করা অবৈধ. এমনকি  হাজতী আসামির জামিন শুনানি ব্যতীত অন্য যে কোনো ধরনের আবেদন শুনানি করা ও নিষ্পত্তি করা অবৈধ.।   যদি রিমান্ড শুনানি করা ও নিষ্পত্তি করা বৈধ হয়,  আসামির স্বীকারোক্তি বা  বিবৃতি লিপিবদ্ধ করা বৈধ হয় এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের 22 ধারার অধীনে ভিকটিমের জবানবন্দি গ্রহণ করা বৈধ হয় তাহলে অবশ্যই আত্মসমর্পণকারী আসামির জামিনের আবেদন শুনানী ও নিষ্পত্তি  করাও বৈধ  ।  অন্যথায় আত্মসমর্পণকারী আসামির জামিনের আবেদন গ্রহণ না করাটা হলো সংবিধান ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত হইবে । 

আত্মসমর্পণকারী আসামির জামিনের আবেদন নিষ্পত্তি করার প্রস্তাবিত পদ্ধতি:

আত্মসমর্পণকারী আসামির স্বাক্ষর কিংবা টিপসহি  ওকালতনামাতে গ্রহণ করার পর সংশ্লিষ্ট আত্মসমর্পণকারী আসামিকে বিজ্ঞ আইনজীবী মহোদয় সংশ্লিষ্ট আদালতের সি এস আই এর নিকট পাঠাবেন। জামিন শুনানিতে জামিন হইলে তিনি সিএস আই এর অধীন হইতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী  মহোদয়ের  নিকট জামিন বন্ডে  স্বাক্ষর বা  টিপসহি দিয়ে তার বাড়িতে চলে যাবেন. ।  অন্যদিকে জামিন প্রাপ্ত না হলে সিএসআই সংশ্লিষ্ট জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হইতে cw গ্রহণ করে  উক্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রহরার মাধ্যমে জেলখানায় প্রেরণ করিবেন। 


লেখক : সাবেক বিচারক  ও  আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
ইমেইল: [email protected]

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ