1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ০৫:২৩ অপরাহ্ন

মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই আইন বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা প্রয়োজন

  • প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৩৮ বার পঠিত হয়েছে

শেখ সাদী রহমান: শাহানা (ছদ্মনাম) বয়স প্রায় ষাট। তার স্বামী ছোট একটা বেসরকারি চাকরি করতেন। বর্তমানে মৃত। শাহানার তিন ছেলে যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কোনো ছেলে তার দেখাশোনা করেন না। শাহানা কোনোমতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছোটখাটো গৃহস্থালি কাজ করে যা পায় তা দিয়েই দিনাতিপাত করছেন। তিনি জানেন না- তার ছেলেরা তাকে ভরণপোষণ দিতে আইনত বাধ্য। না দিলে তাদের জেল-জরিমানা হবে। শাহানার ছেলেরা জানেন না- তাদের মাকে ভরণপোষণ না দিলে তাদের শাস্তি হতে পারে।

শাহানা তার বাবার বাড়ি থেকেও কোনো সম্পত্তি পাননি। তাকে তার দুই ভাই বুঝিয়েছিল- বাবার সম্পত্তি থেকে ভাগ নিলে নাকি অভিশাপ লাগবে। আইন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা না থাকায় এভাবে শত শত শাহানা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ঘিরে রেখেছে আইন।

আইন হচ্ছে- এমন কিছু বিধিবিধান, এমন কিছু নিয়ম যেগুলোকে কেন্দ্র করে মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক এমনকি রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আইনের ব্যাখ্যায় আইন বলতে অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোনো প্রথা বা রীতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সাধারণভাবে আইন ও আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা হলো- বিচার ব্যবস্থা মূলত বিচারকবৃন্দ এবং আইনজীবীগণের ওপর ন্যস্ত। শুধু এই দুই শ্রেণীর নাগরিককে দেশের সকল আইন জানতে হয়। যখন কোনো আইন ভঙ্গ করা হয় অথবা অপব্যাখ্যা করা হয় বা অপপ্রয়োগ করা হয় তখন পুলিশ, আইনজীবী এবং বিচারকের কাজ হচ্ছে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে বিচার করার সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

প্রকৃতপক্ষে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কেবল পুলিশ, আইনজীবী এবং বিচারকের একক দায়িত্ব নয়, একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আইনের অন্যতম সাধারণ নীতি হলো- ‘Ignorantia juris non excusat’ । এটা একটি ল্যাটিন পরিভাষা যার মানে হচ্ছে- আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়। আরও সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, কোনো ব্যক্তি আইন জানেন না তাই অপরাধ করেছেন এ কথা বলে দায়মুক্তি পাওয়া যাবে না।

সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। সংবিধান ও আইন মান্য করতে হলে সংবিধান ও আইন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা নিতান্তই আবশ্যক। অন্যদিকে সংবিধানের ৩১নং অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে আইন জানা থাকলে আইনের আশ্রয় লাভ করা সহজ হয়। অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকলে তবেই অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়া যায়।

সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। সুতরাং সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং অন্যের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আপনার অবশ্যই আইন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা  প্রয়োজন।

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক,  উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষা- এই চারটি স্তরে বিভক্ত করা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দুইটি ধারা- সাধারণ শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণ, কারিগরি এবং মাদ্রাসা এই তিনটি ধারা রয়েছে।  কিন্তু মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কোথাও আইন বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার মতো পাঠ্যক্রম চালু নেই।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর ১৫তম অধ্যায়ে আইন শিক্ষার উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে । কিন্তু এতে কেবল  বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইন কলেজসমূহের ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়ে বলা হয়েছে। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে আইন শিক্ষা অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হয়নি।

১৯৪৮ সালের  সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে- এই শিক্ষার অধিকার এমন হবে যা ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন এবং মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার মর্যাদাকে আরও সমুন্নত করবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদের ১৩নং অনুচ্ছেদেও একই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, মুক্ত সমাজে কার্যকর অংশগ্রহণ, অন্যের অনুভূতির প্রতি সহমর্মিতা বৃদ্ধি, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার মধ্যে সহনশীলতা ও প্রীতির সম্পর্ক তৈরি এবং শান্তি সুরক্ষায় জাতিসংঘের কাজে অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষা সকল ব্যক্তিকে সমর্থ করে তুলবে। এই প্রেক্ষিতে ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন এবং মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় আইনের সহজ পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন।

আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অধিকাংশ অপরাধ সংগঠিত হয় অপরাধ পরবর্তী পরিস্থিতি চিন্তা না করে। কিছু অপরাধী আছে যারা অপরাধের শাস্তির কথা যদি জানতো ওই অপরাধের কথা হয়তো চিন্তাও করতো না। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে সংগঠিত ধর্ষণের ঘটনাগুলো থেকে দেখা যায়, অপরাধী ছিল  দিনমজুর, না হয় ভবঘুরে অথবা বাসের হেলপার। চলন্ত বাসে ধর্ষণের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেখানে আসামি ছিল বাস ড্রাইভার এবং হেলপার। কয়েক দিন আগে ধর্ষণ থেকে রক্ষা পেতে এক কিশোরী চলন্ত লঞ্চ থেকে মেঘনা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই ঘটনায়ও অভিযুক্ত ব্যক্তি লঞ্চের বাবুর্চি। ধর্ষণ পরবর্তী গ্রেপ্তার, পুলিশ রিমান্ড, কারাবাস, বিচার শেষে যাবজ্জীবন কারাবাস এসব বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকলে হয়তো আসামি ধর্ষণ করার পূর্বে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতো।

বাংলাদেশের সড়ক পথে লাগামহীনভাবে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে সেগুলোর কারণ অনুসন্ধানে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, গাড়িচালক অথবা পথচারীর সড়ক ও মোটরযান বিষয়ক আইন সম্পর্কে প্রাথমিক কোনো ধারণা নেই। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অবশ্যই প্রচলিত আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আপনি যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট আইনে আপনার জন্য প্রদেয় সেবা সম্পর্কে অবগত থাকেন তাহলে আপনাকে কেউ হয়রানি করতে পারবে না, কোনো রকম অবৈধ সুবিধা আদায় করতে পারবে না। আইন সম্পর্কে অজ্ঞতাই অনেক ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত হওয়ার কারণ।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এ বলা হয়েছে, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভের অধিকার বাংলাদেশের সকল নাগরিকের এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী সকল ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার। সংবিধান অনুযায়ী  আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ও দায়িত্বশীল নাগরিক সৃষ্টির জন্য আইন শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শিক্ষানীতিতে আরও বলা হয়েছে, দেশে ন্যায়বিচার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও সঠিক ও যুগোপযোগী আইন শিক্ষা প্রয়োজন।

২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে,  সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে তথ্য অধিকার। জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে সকল সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি, বিধিবদ্ধ সংস্থা, বেসরকারি সংস্থাসহ সকল প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং তা দুর্নীতি নামক সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ে সহায়ক হবে।

দেশের প্রচলিত আইন এবং আইন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা মৌলিক অধিকার আদায়ের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি দেশের জাতীয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ডেইলি স্টার অফিসে তরুণ আইনজীবীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় তরুণ আইনজীবীরা মতামত দেন যে, জনগণকে স্থানীয় এবং জেলা পর্যায়ে প্রচলিত আইনগত সেবা সম্পর্কে অবগত করা হলে ছোটখাটো বিবাদের বিষয়গুলো উচ্চ আদালতে উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। তরুণ আইনজীবীরা মনে করেন, জনগণকে নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তা অধিকার, সড়কের নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাত, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ খাত ভিত্তিক আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষিতে প্রাথমিক আইন শিক্ষার বিষয়টি জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রথমেই একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, বিচারকসহ আইন অঙ্গনের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এই কমিটি যথাযথ বিচার বিশ্লেষণ করে গাইডলাইন তৈরি করবে যার মাধ্যমে উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রচলনের জন্য আইনের সহজ পাঠ প্রস্তুত করা হবে।

আইন বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সফলতার সঙ্গে প্রচলন করা সম্ভব হলে আশা করা যায়, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের করণীয় সম্পর্কে  যত্নবান থাকবে যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার কাজে সহায়ক হবে।

শেখ সাদী রহমান

সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা।

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ