1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০১:২৩ পূর্বাহ্ন

মামলা জট ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের মধ্যস্থতায় এ.ডি.আর

  • প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২০
  • ৭৮৭ বার পঠিত হয়েছে

মো. জাকির হোসাইন ||

বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি এবং দেশের বিদ্যমান আইন শৃংখলা ও বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভূমি নিয়ে জটিলতা ও মামলা অত্যধিক হয়। দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৩৬ লক্ষ মামলা বিচারাধীন এবং অধস্তন আদালতে প্রায় ৩১ লক্ষ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। প্রায় ৩১ লক্ষ মামলার বিপরীতে মাত্র ১৬০০ বিচারক নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে সবচেয়ে কম বিচারক আছে এবং বলা হয়ে থাকে প্রতি ১০ লক্ষ জনগণের জন্য একজন বিচারক নিয়োজিত আছেন।

বাংলাদেশে দেওয়ানী মামলা ও আদালতের কার্যক্রমে আইনী জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেক বেশি। দেশে প্রায় ১৩ লক্ষ দেওয়ানী মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ফৌজদারী মামলার প্রায় ৭০% মামলা ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকে উদ্ভূত। পারিবারিক বিরোধ নিয়ে যৌতুক ও নারী নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রায় ১,৩০,০০০ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন প্রণয়ন করার মাধ্যমে ২০১৩ সালে আইন সংশোধন করে ২১এ ধারায় সিনিয়র সহকারী
জজ/সহকারী জজ পর্যায়ের বিচারক কে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার হিসাবে আইনগত মতামত ও আপোষ মীমাংসা করার ক্ষমতা প্রদান করেন। এছাড়া বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এ.ডি.আর ও আইনী মতামত) বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার কে বিরোধীয় পক্ষদের মধ্যে আইনী কাঠামোর মাধ্যমে আদালতের বাহিরে আপোষ মীমাংসা করার ক্ষমতা প্রদান করেন। সরকার আপোষ মীমাংসার বিষয়টি কে কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দেওয়ানী কার্যবিধি আইন, ১৯০৮ সংশোধনক্রমে উক্ত আইনের ৮৯এ এর ১ উপধারায় আদালতে বিদ্যমান দেওয়ানী মামলা আপোষ মীমাংসা (এ.ডি.আর) করার লক্ষ্যে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার কে ক্ষমতা প্রদান করা হয়। আপোষ মীমাংসা ও আইনগত মতামত বিধিমালা ২০১৫ এবং দেওয়ানী কার্যবিধি আইন মোতাবেক জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মামলা দায়েরের পূর্বে এবং মামলা দায়েরের পরে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যে আপোষ করার বিষয়ে আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ব্যাপক সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে মামলার পূর্ব আপোষ প্রক্রিয়া অধিক ফলপ্রসূ মর্মে প্রতীয়মান হয়। যে কোন নাগরিক আইনগত যে কোন বিষয়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের নিকট আবেদন করলে বা অভিযোগ দায়ের করলে তিনি আইনগত বিষয়টি পর্যালোচনা পূর্বক মীমাংসাযোগ্য বিরোধের বিষয়ে আপোষ মীমাংসার লক্ষ্যে বিবাদীপক্ষ কে নোটিশ করতে পারবেন ও বিবাদীপক্ষ নোটিশ পেয়ে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে উভয়পক্ষের মধ্যে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মীমাংসা সভার আয়োজন করবেন। উক্ত মীমাংসা সভায় উভয়পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার আপোষ মীমাংসা সম্পূর্ণ করতে পারবেন। তিনি উভয়পক্ষ কে মীমাংসাপত্র (এ.ডি.আর) প্রদান করবেন এবং বিধিমালা অনুযায়ী উক্ত মীমাংসাপত্র একটি আইনী দলিল ও প্রমাণ হিসাবে আইনগত ভিত্তি লাভ করবে এবং সর্ব আদালতে গ্রহণযোগ্য মর্মে বিবেচনা করবে।


দেওয়ানী মামলা চলমান অবস্থায় দেশের সকল আদালত থেকে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যে আপোষ মীমাংসার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ দেওয়ানী মামলা সমূহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের নিকট প্রেরণ করতে পারবেন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার উক্ত মামলা গ্রহণ করে উভয়পক্ষ কে নোটিশ করে মীমাংসা সভার আয়োজন করবেন। তিনি তার আইনী জ্ঞান,
নিরপেক্ষতা, আন্তরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সকল পক্ষের সম্মতি গ্রহণ করে আপোষ মীমাংসা সম্পূর্ণ করবেন এবং উক্ত মীমাংসাপত্র (এ.ডি.আর) সহ মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রেরণ করবেন। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি গ্রহণ পূর্বক প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে উক্ত গৃহীত আপোষ মীমাংসার ভিত্তিতে রায় ও ডিক্রি প্রচার করবেন। উক্ত গৃহীত আপোষ মীমাংসা ডিক্রির অংশ হিসাবে গণ্য হবে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার যদি উভয়পক্ষের মধ্যে আপোষ করতে ব্যর্থ হন তাহলে তিনি তার গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে বর্ণনা করে বিজ্ঞ আদালতে মামলাটি প্রেরণ করবেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গরীব ও অসহায় মানুষদের আইনী সহযোগিতার উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী লিগ্যাল এইড এর ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ৬৪ টি জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একজন বিচারকের অধিনে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আপোষ মীমাংসার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা এর রিপোর্ট অনুযায়ী গত ১০ বৎসরে ৫,০৭,০৪০ ব্যক্তি আইনগত সুবিধা পায়। গত ২০১৮-১৯ বৎসরে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ৮ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার, ১০ হাজার ৩৫৭ ব্যক্তিকে সরাসরি আইনী সুবিধা প্রদান ও ২৪৩ টি মামলা আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়। এছাড়া জুলাই ২০১৫ হতে সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত সময় সারাদেশের লিগ্যাল এইড অফিস সমূহ ৪ হাজার ৬২১ টি মামলা পূর্ববর্তী ও ৬৬৫ টি চলমান মামলার আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন। এই সময়ে ৫ কোটি ৪৩ লক্ষ ৬৭ হাজার ৯১৩ টাকা আপোষ মীমাংসার মাধ্যমে উদ্ধার পূর্বক পক্ষদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা এ পর্যন্ত র্সবমোট ১,২৬,৪৯২ টি লিগ্যাল এইড মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

দেশের র্সবোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে ২০,০৯২জন দরিদ্র অসহায় বিচারর্প্রাথী সুপ্রীম র্কোট লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে আইনগতসহায়তা প্রাপ্ত হয়েছে। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা ২০১২ সাল থেকে ২০২০ (ফেব্রুয়ারি) সাল র্পযন্ত কারাগারে আটকে থাকা ৭৭,০৬৫ জন অসহায় কারাবন্দিকে সরকারি আইনগত সহায়তা প্রদান করে বিচার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে র্কাযকরী ভূমিকা পালন করেছে। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা জুলাই, ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ (ফেব্রুয়ারি) সাল র্পযন্ত র্পযন্ত ৬৪ টি লিগ্যাল এইড অফিস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম জেলার শ্রমিক আইন সহায়তা সেল এর মাধ্যমে ৩৩,০৮৬ টি বিরোধ/মোকদ্দমার মধ্য থেকে ২৭,৭২৮ টি বিরোধ/মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করে ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষকে মোট ৩৫,৩৬,১৩,৪২২/- (পঁয়ত্রিশ কোটি ছত্রিশ লক্ষ তেরো হাজার চারশত বাইশ) টাকা আদায় করে দিয়ে আদালতের মামলাজট হ্রাস করতে গুরুত্বর্পূণ ভুমিকা পালন করেছে। আর এ সেবার মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৪০,৭৬৫ জন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার সরকারি আইনগত সহায়তায় জাতীয় ৩ হেল্পলাইন ১৬৪৩০ কলসেন্টার উদ্বোধন করেন। এই হেল্পলাইনের মাধ্যমে ২৮ এপ্রিল ২০১৬ খ্রি: হতে ফেব্রুয়ারি/২০২০ খ্রি: সময়ে মোট ৮৩,৯১৮ জন আইনি পরার্মশ গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে সারা দেশে পূর্ণ সময়ের জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ/সহকারী জজ) হিসাবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি অফিস জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নীচ তলায় তাদের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। লিগ্যাল এইড অফিসারগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত, আইনগত বিচার বিশে্লষণপূর্বক মামলার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আপোষ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে এ.ডি.আর কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রত্যেক অফিস দৈনিক প্রায় ১-১০ টি মামলার বা দরখাস্তের আপোষ নিষ্পত্তি ও কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। প্রায় শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ক্ষেত্রে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ আলোর মুখ দেখে।

উল্লেখ্য যে, বিদ্যমান আইনে আদালতের বাহিরে শুধুমাত্র জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমেই মামলার বা বিরোধের আইনগত প্রক্রিয়ায় আপোষ মীমাংসার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার, মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে এ.ডি.আর কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা, এনজিও ও সরকারের বিভিন্ন অফিসের সাথে সমন্বয় করে এ.ডি.আর কার্যক্রম কে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এ.ডি.আর কার্যক্রম কে বেগবান করা সম্ভব হলে আদালতের মামলার জট ব্যাপক হারে
কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক ও ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে এ.ডি.আর খুবই ফলপ্রসু, সাশ্রয়ী, গতিশীল ও কার্যকর উপায় হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এ.ডি.আর এর সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে, এখানে কম সময় ও কম খরচে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যে উভয়ের সম্মতিক্রমে আইনগত প্রক্রিয়ায় বিরোধ মীমাংসা করা হয়। ফলে পক্ষগণ পুনরায় নতুন করে বিরোধে জড়ায় না এবং নতুন কোন
মামলার প্রয়োজন হয় না। আমরা আশা করতে পারি যে, বর্তমান সরকার গণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং কার্যকর বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে মামলার জট নিরসনকল্পে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস কে একটি কার্যকর, গতিশীল ও আপোষ মীমাংসার কেন্দ্রস্থল হিসাবে এর কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

লেখক : সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ফেনী

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ