1. [email protected] : dalim :
  2. [email protected] : dalim1 :
শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন

রাজা নাকি প্রতারক?

  • প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০
  • ৭১৮ বার পঠিত হয়েছে

ভাওয়াল রাজ কুমারের ঐতিহাসিক মামলার কাহিনী নিয়ে পার্থ চ্যাটার্জি-র আখ্যান  ” A Princely Imposter?”

ভাওয়াল রাজকুমারের মৃত্যু, তার বারো বছর পর প্রত্যাবর্তন এবং নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য মামলার অত্যাশ্চর্য কাহিনী শোনা ছিলো আগেই, তবে এই বইটির বিশেষত্ব শুধু কাহিনি বর্ণনাতেই নয়- মামলা, শুনানি,  সাক্ষ্য গ্রহণ, আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপন, রায়,  আপীল-এ সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা একজন আইনজীবীর কাছে অন্য মাত্রা পাবে নিঃসন্দেহে।  তাই বইটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারলামনা।

এ ঘটনার সূত্রপাত ১৯০৯ সালে। ঢাকার জয়দেবপুরের ভাওয়াল জমিদারীর অংশীদার ছিলেন তিন কুমার রনেন্দ্র নারায়ণ,  রামেন্দ্র নারায়ণ ও রবীন্দ্র নারায়ণ।  ২৫ বছর বয়সী মেজো কুমার রামেন্দ্র দার্জিলিং যাত্রা করেন স্বাস্থ্য সমস্যা নিরসনের জন্য, সাথে ছিলেন স্ত্রী বিভাবতী, স্ত্রীর বড় ভাই সত্যেন্দ্র, ব্যক্তিগত চিকিৎসক আশুতোষ গুপ্ত এবং জনা বিশেক কর্মচারী। দার্জিলিং এ অবস্থানকালে তার শরীরের দ্রুত অবনতি ঘটে এবং মে মাসের ৯ তারিখ তিনি মারা যান। তার বিধবা স্ত্রী জয়দেবপুরে ফিরে আসেন ক’দিন পরেই। তবে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কুমারের মৃতদেহ দাহ করার জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলেও তা দাহ করা হয়নি।  পরবর্তীতে এমনটিও রটে যে, কুমার জীবিত আছেন এবং সন্ন্যাসীদের সাথে জীবন যাপন করছেন।

এই ঘটনার দীর্ঘ ১২  বছর পর বুড়িগঙ্গা নদী তীরের বাকল্যান্ড বাঁধে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। খবর ছড়িয়ে পড়ে যে রামেন্দ্র কুমার ফিরে এসেছেন।  তার চেহারার সাথে কুমারের চেহারার এতোটাই সাদৃশ্য ছিল যে মানুষ খুব সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে। ঘটনাক্রমে সন্ন্যাসী জয়দেবপুর যান এবং পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।  পরিবারের সব সদস্য এমনকি প্রজারাও তাকে মেজো কুমার বলে মেনে নেয় কিন্তু বাধ সাধেন তার স্ত্রী বিভাবতী। তিনি কোনোভাবেই এই আগন্তুককে তার স্বামী বলে মেনে নিতে চান না।

এ ঘটনার বেশ আগেই ভাওয়াল জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডস এর অধীনে চলে গিয়েছিল। রাজস্ব বোর্ডের কালেক্টরও এই ব্যক্তিকে ভন্ড বলে আখ্যা দেয়।

অবশেষে ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় ঢাকা জেলার সাবজজ আদালতে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এবং ভাওয়াল রাজের এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তি দাবী করে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। আর্জিতে তার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ এই ছিলো যে, দার্জিলিং এ তার তথাকথিত মৃত্যুর পর তাকে শ্মশানে নেয়া হয়, সেই সময় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হওয়ায় শ্মশান যাত্রীরা দাহ সম্পন্ন না করে দূরে ছাউনির নিচে অপেক্ষা করতে থাকে। এসময় একদল নাগা সন্ন্যাসী তাকে উদ্ধার করে এবং তাকে জীবিত দেখে তার সেবা যত্ন করে সুস্থ করে তোলে। এরপর এই দীর্ঘ সময় তিনি সন্ন্যাসীদের সাথেই থেকে যান। ঘটনাক্রমে তার স্মৃতি ফিরে আসলে ১২ বছর পর নিজ জায়গায় ফিরে  আসেন। তার স্ত্রী বিভাবতী দেবীকে এই মামলার প্রথম বিবাদী করা হয়।

১৯৩৩ সালে এই মামলাটি ঢাকা জেলার সাবজজ পান্নালাল বসুর আদালতে যায়।বাদীর আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার বিজয় চন্দ্র চ্যাটার্জি এবং বিবাদী পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার অমিয় নাথ চৌধুরী। ১৯৩৪ এর নভেম্বর থেকে ১৯৩৬ এর মে মাস পর্যন্ত মোট ৬০৮ কার্যদিবসে মামালাটির শুনানি হয়। বাদীপক্ষ ১০৪২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে, অন্যদিকে বিবাদী পক্ষে ৪৩৩ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।

পান্নালাল বসু তার ৫২৫ পৃষ্ঠার রায়টি নিজ হাতে টাইপ করেছিলেন যেন তা বাইরে প্রচার না পায়। রায়ে তিনি সাক্ষ্য প্রমানাদি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাদী তার পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিবাদী পক্ষের আইনজীবীর কৌশলগত কিছু ত্রুটির কারণে মামলার রায় তাদের বিপক্ষে যায়।

এ রায়ের বিরুদ্ধে বিবাদী পক্ষ আপীল করে হাইকোর্টে,  এই আপীলের পেপার বুক ছিল ১১,৩২৭ পৃষ্ঠার। আপীল বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন এল. ডব্লিউ.  জে. কস্টেলো, চারু চন্দ্র বিশ্বাস ও আর. এফ. লজ। আপীলের শুনানি শেষ হয় ১৯৩৯ সালের ১৪ আগস্ট। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আপীলটি খারিজ হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।  চারুচন্দ্র ও কস্টেলো পান্নালাল বসুর রায় ও ডিক্রি সমর্থন করেন।

রানী বিভাবতী পরাজয় মেনে নিতে চাননা, লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে আবার আপীল করেন তবে এই আপীলও খারিজ হয়ে যায় ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই।  ৩১ জুলাই রামেন্দ্র নারায়ণ এই খবর পান এবং খুশি হয়ে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটে অবস্থিত ঠনঠনিয়া কালী মন্দিরে পূজা দিতে যান। সেখানে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

রানী বিভাবতী এরপর আরও বিশ বছর বেঁচে ছিলেন।  তার ভাষ্য ছিলো এই যে, পৃথিবীর সব আদালতে তিনি হেরে গেলেও ঈশ্বরের আদালতে প্রতারকের শাস্তি ঠিকই হয়েছে। 

বইটিতে লেখক বর্ননা করেছেন এই মামলা পরিচালনায় এবং রায়ের ওপর কিভাবে ঔপনিবেশিকতা ও জাতীয়তাবাদ প্রভাব বিস্তার করেছে। পরিশেষে লেখক পাঠকের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, বিচারকরা তো সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন কিন্তু সব যুক্তি তর্কের উর্দ্ধে পাঠকের কাছে কুমার কি নিজেকে আসলেই প্রমান করতে পেরেছেন?

এমন অদ্ভুত ঘটনা এবং অত্যাশ্চর্য মামলার বিশদ  বর্ননাসম্বলিত বইটি সকল আইনজীবীর কাছেই সুখপাঠ্য হবে বলে আমার ধারনা। 

# A Princely Imposter?

By Partha Chatterjee

Princeton University Press

First published in 2002

লেখকঃ ঊর্মি রহমান

 ব্যারিস্টার এট ল,

আইনজীবী,  বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

অনুগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কীত আরো সংবাদ